ভূরাজনৈতিক কারণে পরিষেবা প্রভাবিত হওয়ায় পাকিস্তানে পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ বা সারচার্জ নিচ্ছে বিদেশী শিপিং লাইনগুলো। কিছু কোম্পানি চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে ইমার্জেন্সি অপারেশনাল রিকভারি সারচার্জ (ইওআরএস) চালুর পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া পাকিস্তানি পণ্য রয়েছে এমন জাহাজের ওপর ভারতীয় বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ছে দেশটির বাণিজ্যে। খবর ডন ও দ্য নিউজ।
ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পেহেলগামে গত ২৩ এপ্রিল সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতের ঘটনায় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে অপারেশন সিন্দুর নামে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে ভারতীয় হামলার কারণে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ ঝুঁকির কারণে কয়েকটি শিপিং লাইন এখন পাকিস্তানি বন্দরে পণ্য পাঠানো বন্ধ এবং কিছু কোম্পানি সারচার্জ আরোপ করছে।
ফ্রান্সভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম সম্প্রতি জানিয়েছে, ১৫ মে থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে আনা-নেয়া সব ধরনের চালানের ওপর ইওআরএস আরোপ হবে।
সিএমএ সিজিএম বলছে, এ অঞ্চলজুড়ে ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলির কারণে আমাদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। পরিষেবার ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে এ সারচার্জ প্রয়োজনীয়।
সারচার্জের পরিমাণ ইউনিটপ্রতি ৩০০-৮০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ পাকিস্তান থেকে ইউরোপ, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও এশিয়ায় পণ্য পাঠানো, আবার পণ্য আনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
করাচি কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (কেসিএএ) সাবেক চেয়ারম্যান ইউনুস সুমরো জানান, সিএমএ সিজিএম ছাড়াও আরেকটি বিদেশী শিপিং কোম্পানি একইভাবে ৩০০-৮০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করছে।
তিনি বলেন, ‘ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ সমুদ্রপথে না ঘটলেও বিদেশী শিপিং কোম্পানিগুলো বিভিন্ন চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত সারচার্জ ও ভাড়া পাকিস্তানের রফতানিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
সামগ্রিক পরিস্থিতি পণ্য আনা-নেয়ার সময়কে প্রভাবিত করতে পারে বলে জানান পাকিস্তান শিপস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (পিএসএএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাজপার। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, ট্রানজিট সময় ও ভাড়া বাড়বে।’
পাকিস্তানি পণ্য পরিবহন করে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের এমন জাহাজকে সম্প্রতি নিজেদের বন্দরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভারতীয় এ নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক কনভেনশনগুলোর পরিপন্থী। পাকিস্তানি বন্দর ব্যবহারে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনকে নিরুৎসাহিত করা এর উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
মোহাম্মদ রাজপার বলেন, ‘ভারতের অপ্রত্যাশিত ও অযৌক্তিক পদক্ষেপের নিন্দা জানাই। পিএসএএ সদস্য ও আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো পাকিস্তানে বাণিজ্য সংযোগ নিশ্চিত রাখতে তাদের সেবা নতুনভাবে সাজাবে।’
রফতানিকারক ও সরবরাহকারীরা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে পাকিস্তানে পণ্য আনা-নেয়ায় উল্লেখযোগ্য বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান খরচ ও সরবরাহ চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে একজন রফতানিকারক বলেন, ‘আমরা সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারছি না এবং বিদেশে গ্রাহকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে।’
পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী খুররম ইজাজ জানান, ফেডারেশন অব পাকিস্তান চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফপিসিসিআই) বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে এবং সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করছে। তবে স্বীকার করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিপিং লাইনগুলো দীর্ঘ রুট বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
করাচি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (কেসিসিআই) প্রেসিডেন্ট জাভেদ বিলওয়ানি ফেডারেল সরকারকে শিপিং লাইনগুলোর সঙ্গে সারচার্জ বিষয়ে আলাপের আহ্বান জানান।
এদিকে ভারতে পাকিস্তানি পণ্যবাহী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ভারতীয় পণ্য বহনকারী কার্গো জাহাজকে পাকিস্তানি বন্দরে নোঙর করার অনুমতি দিয়েছে দেশটির সরকার।
৩ মে পাকিস্তানের সমুদ্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এক নির্দেশনা জারি করা হয়। যেখানে বলা হয়, ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজের পাকিস্তানি বন্দরে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজের ভারতীয় বন্দরে যাত্রাও সীমিত করা হয়েছে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বিবেচনা করা হবে।
এ ঘোষণার পর পিএসএএ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল নিষেধাজ্ঞাটি রিশিপমেন্ট অন বোর্ড (আরওবি) কার্গোর ওপর প্রযোজ্য কিনা। সংস্থাটির মতে, পাকিস্তানের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে তাদের এ তথ্য জানা প্রয়োজন।
জবাবে পাকিস্তান বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে আরওবি কার্গো, যা শুধু ট্রানজিটে পাকিস্তানের বন্দর অতিক্রম করছে এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে না, সেক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এটি নিশ্চিত করে যে সমুদ্রপথে ট্রানজিট বাণিজ্য বিশেষ করে আরওবি কার্গো, যা ভারত থেকে বা ভারতের দিকে যাচ্ছে সেটি চলমান থাকবে।’
এ বিবৃতি সমুদ্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পিএসএএকে পাঠানো হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য অংশীদারদের আশ্বস্ত করা যে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী তার সমুদ্রপথ এবং ট্রানজিট প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে।
পিএসএএ বলছে, পাকিস্তানের বন্দরে আসা অধিকাংশ বড় কনটেইনারবাহী জাহাজে প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য থাকে ভারতীয়। তাই ভারতের বন্দর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনকে পাকিস্তানি বন্দর ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
২ মে বৈদেশিক বাণিজ্যনীতিতে পরিবর্তন এনে পাকিস্তান থেকে আগত বা রফতানীকৃত সব পণ্যের আমদানি ও ট্রানজিট নিষিদ্ধ করে ভারত। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতীয় বন্দর হয়ে পাকিস্তানে যাওয়ার কথা ছিল এমন ট্রানজিট কার্গো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে করাচি বন্দর থেকে সাপ্তাহিক প্রায় ছয়-সাত হাজার টিইইউ রফতানি ব্যাহত হচ্ছে।